মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সুদহার বাড়িয়ে রেখেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। এর প্রভাব পড়ছে দেশটির ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ও ডলারের বিনিময় হারে। উচ্চ সুদহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পাশাপাশি ডলারে ঋণ গ্রহণকারী অন্যান্য দেশেরও ঋণ বাবদ ব্যয় এখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় ঋণগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে এটি। এ অবস্থায় ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে দেশগুলো। ডলারের পরিবর্তে এখন বিকল্প মুদ্রায় ঋণ নিচ্ছে এসব দেশ।
এক্ষেত্রে যেসব দেশে সুদহার একেবারেই ন্যূনতম বা তুলনামূলক কম (যেমন চীন), সেসব দেশের মুদ্রা প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। বিশেষ করে চীনা রেনমিনবি ও সুইস ফ্রাঁয় ঋণগ্রহণের প্রবণতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেডের উচ্চ সুদহার শুধু ট্রাম্প প্রশাসনেরই ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। এ কারণে উচ্চ ঋণগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রা খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
এফটির এক প্রতিবেদন অনুসারে, কেনিয়া, শ্রীলংকা ও পানামার মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো ঋণের বাজারে এ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের উচ্চ সুদহারের প্রভাবকে তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফেডের সুদহার নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে উষ্মা প্রকাশ করে বক্তব্য রেখেছেন।
এ বিষয়ে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স বার্নস্টাইনের গ্লোবাল ইকোনমিক রিসার্চ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আর্মান্ডো আর্মেন্টার মন্তব্য হলো ‘উচ্চ সুদহার ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের কার্ভ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ডলারে ঋণ নেয়া ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এমনকি উদীয়মান বাজারের ঋণের ক্ষেত্রেও এটি দেখা যাচ্ছে। ফলে তারা আরো সাশ্রয়ী বিকল্প খুঁজছে।’
তিনি জানান, অনেক দেশ সস্তা ও ডলার-বহির্ভূত ঋণে স্থানান্তরকে অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে। কারণ তাদের এখন বাজেটের ওপর চাপ কমাতে ঋণ নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোয় চীনের রেনমিনবিতে ঋণ নেয়ার প্রবণতা চলতি বছর রেকর্ড সর্বোচ্চে দাঁড়িয়েছে। এতে বড় ভূমিকা রেখেছে বেল্ট অ্যান্ড রোড কর্মসূচির আওতায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থায়ন। এর আওতায় বিশ্বজুড়ে শত শত বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে বেইজিং।
তবে রেনমিনবিতে চীন কী পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, এ-সংক্রান্ত এখনো কোনো স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। কারণ বেইজিং সাধারণত দ্বিপক্ষীয়ভাবে ঋণ আলোচনাগুলোর সমাধান করে থাকে। বর্তমানে কেনিয়া ও শ্রীলংকা ডলারে নেয়া বড় আকারের ঋণকে রেনমিনবিতে রূপান্তর করতে চাইছে। গত মাসে কেনিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটি এখন চায়না এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৫০০ কোটি ডলারের রেলওয়ে প্রকল্পের ঋণকে রেনমিনবিতে পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা করছে।
অন্যদিকে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট আনুরা দিশানায়েকে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি হাইওয়ে প্রকল্প সম্পন্ন করতে রেনমিনবিতে ঋণ নিতে চাচ্ছে তার সরকার। ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে না পারায় ২০২২ সালে প্রকল্পটি থেমে গিয়েছিল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ফেড নির্ধারিত সুদহার ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সুদহারের তুলনায় এ হার অনেক বেশি। বড় অংকের এ সুদহারের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ডলারে ঋণগ্রহণের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের তুলনায় এ ঋণের প্রিমিয়াম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বন্ডের নিজস্ব উচ্চ রিটার্নের কারণে মোট খরচ এখনো অনেক বেশি।
অন্যদিকে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক গত বছরের জুনে সুদহার শূন্যে নামিয়ে এনেছে। চীনের সাতদিনের রিভার্স রেপো হার এখন ১ দশমিক ৪ শতাংশ। ডলারে নেয়া ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণেই উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন তা রেনমিনবিতে স্থানান্তর করতে চাইছে বলে মনে করছেন কলম্বোভিত্তিক ফ্রন্টিয়ার রিসার্চের অর্থনীতিবিদ থিলিনা পাণ্ডুয়াওয়ালাও।
২০১০-এর দশকে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের আওতায় ডলারে বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়েছিল চীন। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার অনেক কম ছিল। ওই সময়ের তুলনায় কেনিয়া ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলোর ঋণের খরচ এখন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না-আফ্রিকা রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের ফেলো ইউফান হুয়াং বলেছেন, ‘বেইজিংয়ের বড় লক্ষ্য হলো রেনমিনবিতে ঋণ সম্প্রসারণ। তবে অনেক ঋণগ্রহীতা দ্বিধাগ্রস্ত হওয়ায় এখনো রেনমিনবিতে ঋণ গ্রহণের হার কম। আপাতত এটি দেশভিত্তিক কার্যক্রমের মতো দেখাচ্ছে। যেমনটা কেনিয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি।’
এর কারণ হলো সাধারণত রেনমিনবি বা সুইস ফ্রাঁয় রফতানি আয় আসে না। তাই এ মুদ্রায় ঋণ নেয়ার ফলে বিনিময় হারের ওঠা-নামা সৃষ্ট ঝুঁকির আশঙ্কা থেকে যায়।
পানামা গত জুলাইয়ে প্রায় ২৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সুইস ফ্রাঁ ঋণ নিয়েছে। কারণ দেশটির সরকার বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করতে ও ঋণমান কমে যাওয়া এড়াতে চেষ্টা করছে। পানামার অর্থমন্ত্রী ফেলিপে চ্যাপম্যান জানিয়েছেন, ২০ কোটি ডলারের বেশি সাশ্রয় হয়েছে তাদের। তাই শুধু মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভর না করে পানামা ইউরো ও সুইস ফ্রাঁ ঋণগ্রহণের মাধ্যমে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য এনেছে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়াও এখন সুইস ফ্রাঁয় ঋণগ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছে। এক্সপি ইনভেস্টমেন্টসের ল্যাটিন আমেরিকা ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান আন্দ্রেস পার্ডোর ভাষ্যমতে, ‘কলম্বিয়া কম সুদে সুইস ফ্রাঁয় ঋণ নিচ্ছে। এতে তারা ৭-৮ শতাংশ রিটার্নের ডলারভিত্তিক ঋণ ও ১২ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় মুদ্রা পেসোয় পরিশোধযোগ্য বন্ডের অর্থ পরিশোধ করতে পারবে।’
তবে ডলারের বিকল্প মুদ্রায় ঋণগ্রহণের কিছু ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, রেনমিনবি বা সুইস ফ্রাঁয় ঋণগ্রহণ সরকারের সুদব্যয় কমিয়ে আনছে ঠিকই, তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ঋণ ডলার বন্ডের বৃহত্তর বাজারে বিকল্প হতে পারে না।
এ বিষয়ে উদীয়মান বাজারসংশ্লিষ্ট এক ঋণ তহবিল ম্যানেজার বলেন, ‘ঋণের মেয়াদ ঠিকঠাক পরিচালনা করা গেলে বিকল্প মুদ্রায় নেয়া ঋণগুলো অর্থনীতিকে সাহায্য করতে পারে। তবে এটাও দেখতে হবে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা আবার ডলারভিত্তিক ঋণ বাজারে প্রবেশের সুযোগ রাখছে কিনা।’